এই সরকারের হাতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মৃত্যু ঘটেছে: রিজভী
English

এই সরকারের হাতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মৃত্যু ঘটেছে: রিজভী

এই সরকারের হাতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মৃত্যু ঘটেছে: রিজভী

‘নতজানু মিডনাইট অটো পাসের সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনলে মনে হয় তারা স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রী নন, তারা অন্য কোনো দেশের প্রতিনিধি। বর্তমান আওয়ামী সরকারে হরেক কিসিমের ক্রীতদাস ও মোসাহেবে পরিপূর্ণ।’

রবিবার (২০ ডিসেম্বর) দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বাস্তবে এই সরকারের হাতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মৃত্যু ঘটেছে। তারা শুধুমাত্র অবৈধভাবে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার জন্য প্রভুদের তোষামোদিতেই ব্যস্ত। ফলে জনগণের জানমাল ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নিজেদের ক্ষমতাকে আগলে রাখাকেই বড় কাজ বলে মনে করছে সরকার।

তিনি আরও বলেন, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিশিরাতের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সাহেবের মন্তব্য দেখে শুনে মনে পড়ছে মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম রচিত ‘বঙ্গবাণী’ কবিতার দুটি লাইন, ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ জানতে ইচ্ছে করছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন কি স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নাকি বাংলাদেশে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধি? বাংলাদেশের বিজয়ের মাসে বিজয়ের দিনেও সীমান্তে মানুষ হত্যা করা হয়! বিজয়ের মাসে, এমনকি বিজয় দিবসে সীমান্তে মানুষ মারা যাওয়ার পরও যে মন্ত্রীর কোনও বিকার নেই, এরা আত্মা বিক্রি করেছেন বলেই সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যায় বিএসএফ’র পক্ষে নির্লজ্জ সাফাই গাইছেন।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে তিনি বলেন, বিএসএফের নির্বিচারে বাংলাদেশী হত্যার বিরুদ্ধে সরকারিভাবে কার্যকর পদক্ষেপ তো দূরের কথা, মৌখিক কড়া প্রতিবাদ জানাতেও আমরা কখনো দেখিনি। এটা কেবলমাত্র গভীর বেদনাদায়ক, লজ্জার ও নিন্দনীয়ই নয়, বরং আওয়ামী সরকারের ভ্রষ্টাচার, ক্ষমতালোলুপতারই মনোবৃত্তি। সে কারণেই সরকারের মন্ত্রীরা নিজের জনগণের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার ও প্রতিবেশী দেশের বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশীদের হত্যা করতে প্ররোচিত করছেন। জনসমর্থনহীন সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণেই বিএসএফ এমন দুঃসাহস দেখাতে পারছে।

বিএনপির এই শীর্ষনেতা বলেন, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি বিএসএফ সীমান্তে গুলি করে হত্যা করে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রেখেছিলো বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানীর লাশ। সেই বর্বর দৃশ্য আজও দেশের মানুষকে ব্যথিত করে। প্রতিটি দেশপ্রেমিকের হৃদয়ে আজো রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দেশের জনগণ আশা করেছিল, ফেলানী হত্যার বিচার হবে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড কমে আসবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী হত্যার ঘটনা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। কারণ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেই।

তিনি বলেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, এই সরকারের গত ১২ বছরে প্রায় সাড়ে ৫ শত বাংলাদেশীকে সীমান্তে হত্যা করেছে বিএসএফ। এই করোনার মধ্যেও গত প্রায় এক বছরে প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে খুন হয়েছে ৪৫ জন বাংলাদেশী। এছাড়াও সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ড ও নদীতে প্রায়ই বাংলাদেশীর রহস্যজনক লাশ পাওয়ার ঘটনা খবরে আসে।

সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বর্ডার গার্ডের তরফ থেকে পতাকা বৈঠক করে লাশ গ্রহণ ছাড়া ভরসা রাখার মতো কোনও তৎপরতাই এখন চোখে পড়ে না। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথে সমমর্যাদা ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সীমান্তে বাংলাদেশিদের পাইকারি হারে খুন করে যাবে, অথচ শুধু চুপচাপ নয় বাংলাদেশ সরকার বরং বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যার বৈধতা দিচ্ছে।’

বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, ভোটারবিহীন সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে রক্তাক্ত সীমান্ত এখন বাংলাদেশের সীমান্ত। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা এখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি ভয়ঙ্কর বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। তামাম দুনিয়ায় এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যার নজির নেই। পৃথিবীর কোনও আইনেই এর সমর্থন নেই। সীমান্ত হত্যা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ- যারা এসব ঘটাচ্ছে, তারা রেহাই পেয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের জনগণ মনে করে, ১৯৬৮ সালে আইয়ুব-মোনেমের ছাত্র সংগঠন এনএসএফে’র নেতা আব্দুল মোমেন এখন নিজের মন্ত্রিত্ব রক্ষায় সরকারকে খুশি করতে বাংলাদেশের মর্যাদা নিয়েই টান দিয়েছে। নিশিরাতে বিনাভোটে এমপি হওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে প্রথমেই বিশ্বে এক নতুন ধরনের কূটনীতির ঘোষণা দিয়েছিলেন আব্দুল মোমেন। বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত নাকি ‘স্বামী-স্ত্রীর কূটনীতি’। আবার বলেছেন ‘রক্তের সম্পর্ক’। এসব আবার কোন ধরনের কূটনীতি? বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন এমন আজগুবি ও মেরুদণ্ডহীন কুটনীতির জন্ম দিয়ে আব্দুল মোমেন লজ্জিত না হলেও দেশের জনগণ লজ্জিত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন কূটনীতি চালু করেছেন তা শুধু উজাড় করে দেয়ার, নেয়ার নয়। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। পদ্মা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এখনও পাওয়া যায়নি।

রিজভী আরো বলেন, নিশিরাতের সরকারের আমলে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় প্রতিদিন অনেকের মৃত্যু হয়। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে কাউকে ধরে নিয়ে গিয়েও ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে। এ কারণে এই গণবিরোধী সরকারের কাছে মানুষের মৃত্যু কোনও গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু আত্মমর্যাদাহীন এই সরকারকে কে বোঝাবে, সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনও মৃত্যুর তুলনা চলে না। ভিনদেশের কেউ সীমান্তে আমাদের দেশের নাগরিককে হত্যা করার সাহস কিংবা ঔদ্ধত্ব দেখালে সেটি কোনও সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। সেই হত্যাকাণ্ড শুধু লাশের সংখ্যা দিয়ে বিবেচ্য নয়। বরং, ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের দেশের মান-মর্যাদা, সম্মান ও সম্ভ্রমবোধ জড়িত। এই নিশিরাতের সরকার দিয়ে বাংলাদেশের মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব ও মৎসজীবী দলের সদস্য সচিব আব্দুর রহিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন


Advertisement




Ads Manager

All Rights Resrved & Protected