শুরু হল নাযাতের দশক,ক্বদর ও ইতিকাফের মাধ্যমে অর্জিত হোক জাহান্নাম হতে মুক্তি

শুরু হল নাযাতের দশক
শুরু হল নাযাতের দশক

রমজানের প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাতের, তৃতীয় দশক নাযাতের। প্রথম দশকে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে রহমতের বারিধারা বর্ষণ করে মাগফিরাত ও ক্ষমার উপযোগী করেন। দ্বিতীয় দশকে ক্ষমা করে তৃতীয় দশকে বান্দার জন্য নাজাতের ফায়সালা করেন।

ক্বদর রাত্রির সন্ধান ও জাহান্নাম হতে মুক্তিঃ

রমজানের শেষ ১০ দিনে রয়েছে লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। রাসূল (দঃ) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করো।’ (বুখারী: ২০২০)
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই সফল। এবং পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়। (আল ইমরান-১৮৫)

রাসূল (দঃ) বলেছেন, রমজানের প্রতিটি দিবা-রাত্রিতেই আল্লাহর দরবারে অসংখ্য লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয় এবং রমজানের প্রতি দিবারাত্রিতে প্রত্যেক মুসলমানের একটি দোয়া কবুল হয়। (বুখারি)

সুতরাং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এসব নেক আমল বেশি বেশি করে করতে হবে। এছাড়া গোটা রামাদান জুড়েই হযরত মোহাম্মদ (সা.) চারটি কাজ অধিক হারে করার জন্য বলেছেন।
১. কালেমার জিকির,
২. ইস্তেগফার,
৩. জান্নাত চাওয়া,
৪. জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রার্থনা করা।

রামাদানের এই শেষ ১০ দিনেও এই চারটি কাজ বেশি বেশি করতে হবে। সর্বোপরি নিজের গোনাহের জন্য কান্নাকাটি করে দোয়াও করতে হবে। কারণ আল্লাহর ভয়ে কন্দনরত মানুষের চোখের পানি আল্লাহ তাআলা বড় বেশি পছন্দ করেন।

দীর্ঘ হায়াতের পরিপূরকঃ
মুয়াত্তা-ই-ইমাম মালেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূল (দঃ) জানতে পারলেন, পূর্বেকার উম্মতের বয়স অনেক দীর্ঘ হতো এবং সে তুলনায় নিজের উম্মতের বয়স অনেক কম। সুতরাং আমার উম্মতের আমলের পরিমাণ এ হায়াতের ব্যবধানে পূর্বেকার উম্মতের আমলের পরিমাণের সমান হতে পারে না। বিষয়টি অবগত হয়ে রাসূল (দঃ) দুঃখিত হলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা লাইলাতুল কদর প্রদান করেন। যাতে এ সমস্যা ও দুঃখ দূরীভূত হয়। তাই এমন এক রাত দান করলেন যে রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (দঃ) একদা সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর সামনে বনি ইসরাঈলের এমন এক আবিদ ব্যক্তির বর্ণনা করলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে বিরামহীনভাবে এক হাজার মাস জিহাদ করতে থাকেন। রাসূল (দঃ) এর এ বর্ণনা শুনে সাহাবায়ে কেরাম সে লোকটির প্রতি বিমুগ্ধ হয়ে পড়লেন। তখন আল্লাহ পাক এ দীর্ঘ বয়সের বিকল্প স্বরূপ লাইলাতুল কদর প্রদান করেন।

কিয়ামুল লাইল’ অর্থ হলো রাত্রি জাগরণ। মহান আল্লাহর জন্য আরামের ঘুম স্বেচ্ছায় হারাম করে রাত জেগে ইবাদত করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের একটি গুণ। মহান আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাহদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে- ‘তারা রাত্রি যাপন করে রবের উদ্দেশে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে।’ (সূরা ফুরকান : ৬৪)

আল কুরআনুল করীম লাইলাতুল কদরে নাযিল হয়েছে। এ রাতে হযরত জিবরাইল (আ.) ফেরেশতাদের এক বিরাট জামায়াত নিয়ে দুনিয়ার বুকে অবতীর্ণ হন ও জগতবাসীর মধ্যে লাইলাতুল কদরের কল্যাণ ও প্রাচুর্য বিতরণ করেন। এ বিতরণের কাজ ফজর হওয়া পর্যন্ত অনবরত চলতে থাকে। লাইলাতুল কদর আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিরাট নেয়ামত- যার কোনো তুলনা হয় না। এ রাতে ইবাদতের একাগ্রতা হাসিল হয়। অন্তর গাফিল হয় না। এ রাতে আল্লাহ তা’আলা অসংখ্য পাপী বান্দাকে মাফ করে দেন। এ রাতে তওবা কবুল হয়, আসমান-যমীনের রহমতের দরজা খুলে দেয়া হয়। ইবাদতে মাশগুল মুমিনকে ফেরেশতারা সালাম করে। এ রাতে কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামায, তসবীহ-তাহলীল পাঠ করে কাটিয়ে অনেক সওয়াব অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।

রাসুল(দঃ) এর প্রস্তুতিঃ
হাদিস শরিফে এই দশককে ‘ইতক্বুম মিনান নার’ বা জাহান্নাম থেকে মুক্তির দশক বলা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (দঃ) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন রামাদানের শেষ ১০ রাত আসত, তখন নবী করিম (দঃ) কোমরে কাপড় বেঁধে নেমে পড়তেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন। আর পরিবার-পরিজনকেও তিনি জাগিয়ে দিতেন।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস : ১০৫৩)

রামাদানের পুরোপুরি রহমত ও বরকত লাভের জন্য ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইতিকাফ করেছেন, সাহাবায়ে কেরামও করেছেন, তাই আমাদের জন্যও ইতিকাফ করা সুন্নত। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ইন্তেকাল পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, এরপর তাঁর স্ত্রীরাও ইতিকাফ করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৬৮; মুসলিম, হাদিস : ২০০৬)

রামাদান মাসের এদশকের ফযিলত ও বৈশিষ্ট্য। এগুলো হলঃ
(১) এ দশ দিনের মাঝে রয়েছে লাইলাতুল কদর নামের একটি রাত। যা হাজার মাস থেকেও শ্রেষ্ঠ। যে এ রাতে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে ইবাদত-বন্দেগি করবে তার অতীতের পাপগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে।

(২) নবী করিম রাসূলুলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে ইবাদত-বন্দেগিতে বেশি সময় ও শ্রম দিতেন, যা অন্য কোন রাতে দেখা যেত না। যেমন মুসলিম শরীফে আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, তিনি এ রাতে কোরান তিলাওয়াত, জিকির, সালাত ও দুআর মাধ্যমে জাগ্রত থাকতেন এরপর সেহরি গ্রহণ করতেন।

(৩) রমজানের শেষ দশক আসলে রাসূলুলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনের লুঙ্গি শক্ত করে নিতেন। রাত্রি জাগরণ করতেন এবং পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন। যেমন বুখারি ও মুসলিমে আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা বর্ণিত হাদিসে এসেছে। তিনি এ দশদিনের রাতে মোটেই নিদ্রা যেতেন না। পরিবারের সকলকে তিনি এ রাতে ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য জাগিয়ে দিতেন।

রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম লুঙ্গি শক্ত করে নিতেন কথাটির অর্থ হল তিনি এ দিনগুলোতে স্ত্রীদের থেকে আলাদা হয়ে যেতেন।
(৪) এ দশদিনের একটি বৈশিষ্ট্য হল, রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শেষ দশদিনে মসজিদে ইতেকাফ করতেন। প্রয়োজন ব্যতীত তিনি মসজিদ থেকে বের হতেন না।

লাইলাতুল কদরের গুরুত্বঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতকে সকল রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি তার কালামে এ রাতকে প্রশংসার সাথে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর কালাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইরশাদ করেন :

إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ فِي لَيۡلَةٖ مُّبَٰرَكَةٍۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ ٣ فِيهَا يُفۡرَقُ كُلُّ أَمۡرٍ حَكِيمٍ ٤ أَمۡرٗا مِّنۡ عِندِنَآۚ إِنَّا كُنَّا مُرۡسِلِينَ ٥ رَحۡمَةٗ مِّن رَّبِّكَۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡعَلِيمُ ٦ رَبِّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَمَا بَيۡنَهُمَآۖ إِن كُنتُم مُّوقِنِينَ ٧ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحۡيِۦ وَيُمِيتُۖ رَبُّكُمۡ وَرَبُّ ءَابَآئِكُمُ ٱلۡأَوَّلِينَ ٨ #الدخان: ٣، ٨]

নিশ্চয় আমি এটি নাজিল করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়, আমার নির্দেশে। নিশ্চয় আমি রাসুল প্রেরণকারী। তোমার রবের কাছ থেকে রহমত হিসেবে; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। যিনি আসমানসমূহ, জমীন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সব কিছুর রব; যদি তোমরা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণকারী হও। তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু দেন। তিনি তোমাদের রব এবং তোমাদের পিতৃপুরুষদের রব। [দুখান : ৩-৮] বরকতময় রজনি হল লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা একে বরকতময় বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ রাতে রয়েছে যেমন বরকত তেমনি কল্যাণ ও তাৎপর্য। বরকতের প্রধান কারণ হল এ রাতে আল-কোরান নাজিল হয়েছে। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-সিদ্ধান্ত লওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতাদের হাতে অর্পণ করা হয় বাস্তবায়নের জন্য। এ রাতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হল আল্লাহ তাআলা এ রাত সম্পর্কে একটি পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ করেছেন। যা কিয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকবে।

إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ فِي لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ ١ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ ٢ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ ٣ تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيهَا بِإِذۡنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمۡرٖ ٤ سَلَٰمٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ ٥ #القدر: ١، ٥

নিশ্চয় আমি এটি আমি নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। তোমাকে কিসে জানাবে লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। শান্তিময় সে রাত ফজরের সূচনা পর্যন্ত। [সূরা কদর : ১-৫]

এ সূরা থেকে যে বিষয়গুলো জানা গেল :

(১) এ রাত এমন এক রজনি যাতে মানবজাতির হেদায়াতের আলোকবর্তিকা মহা গ্রন্থ আল-কোরান অবতীর্ণ হয়েছে।

(২) এ রজনি হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ তিরাশি বছরের চেয়েও এর মূল্য বেশি।

(৩) এ রাতে ফেরেশতাগণ রহমত, বরকত ও কল্যাণ নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করে থাকে।

(৪) এ রজনি শান্তির রজনি। আল্লাহর বান্দারা এ রাতে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে শান্তি অর্জন করে থাকে।

(৫) সময়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া। এ আয়াতগুলোতে অল্প সময়ে বেশি কাজ করার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হল। যত সময় বেশি তত বেশি কাজ করতে হবে। সময় নষ্ট করা চলবে না।
(৬) গুনাহ ও পাপ থেকে ক্ষমা লাভ। এ রাতের এই ফযিলত সম্পর্কে বুখারি ও মুসলিম বর্ণিত হাদিসে এসেছে—
مَنْ قَامَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ إِيْمَانًا وَّاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব লাভের আশায় কদরের রাতে নফল সালাত আদায় ও রাত জেগে ইবাদত করবে আল্লাহ তার ইতোপূর্বের সকল সগীরা (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করেদেন। [বুখারি : ১৯০১; মুসলিম : ৭৬০]

লাইলাতুল কদর কখন ?
আল-কুরআনে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি লাইলাতুল কদর কোন রাত। তবে কুরআনের ভাষ্য হল লাইলাতুল কদর রমজান মাসে। কিয়ামত পর্যন্ত রমজান মাসে লাইলাতুল কদর অব্যাহত থাকবে। এবং এ রজনি রমজানের শেষ দশকে হবে বলে সহি হাদিসে এসেছে। এবং তা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে হাদিসে এসেছে,
تَحَرُّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الأوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ

রমাযানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর। [বুখারি : ২০২০; মুসলিম : ১১৬৯]

এবং রমজানের শেষ সাত দিনে লাইলাতুল কদর থাকার সম্ভাবনা অধিকতর। যেমন হাদিসে এসেছে,
تَحَرُّوْا لَيْلَةُ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ

তোমরা রমাযানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ কর। [বুখারি : ২০১৭]

অধিকতর সম্ভাবনার দিক দিয়ে প্রথম হল রমজান মাসের সাতাশ তারিখ। দ্বিতীয় হল পঁচিশ তারিখ। তৃতীয় হল ঊনত্রিশ তারিখ। চতুর্থ হল একুশ তারিখ। পঞ্চম হল তেইশ তারিখ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতকে গোপন রেখেছেন আমাদের উপর রহম করে। তিনি দেখতে চান এর বরকত ও ফযিলত লাভের জন্য কে কত প্রচেষ্টা চালাতে পারে।
লাইলাতুল কদরে আমাদের কর্তব্য হল বেশি করে দুআ করা। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা নবী করিম রাসূলুলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, লাইলাতুল কদরে আমি কি দুআ করতে পারি? তিনি বললেন, বলবে—
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। [তিরমিযি : ৩৫১৩]

ইতেকাফঃ
ইতেকাফ হল সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করা। এটা হল সুন্নত। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন :—

«أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ يَعْتَكِفُ العَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللَّهُ، ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ»

রাসূলুল্লাহ রাসূলুলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসের শেষ দশকে মসজিদে ইতেকাফ করতেন। যতদিন না আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেছেন ততদিন তিনি এ আমল অব্যাহত রেখেছেন। তার ইন্তেকালের পর তার স্ত্রী-গণ ইতেকাফ করেছেন। [বুখারি : ২০২৫]

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফে কাটান।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)

এ সময় তিনি আল্লাহর ইবাদতে মসজিদে নির্জন বাস করতেন। দুনিয়াবি সব ধরনের সম্পৃক্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করতেন, ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তাঁর ইতিকাফের জন্য মসজিদে একটি তাঁবু পাতা হতো। ইতিকাফকালীন তিনি রোগী দেখতে বের হতেন না, জানাজায় যেতেন না এবং নারীদের ত্যাগ করতেন। প্রাকৃতিক প্রয়োজনের মতো জরুরি কিছু ছাড়া তিনি তাঁর ইতিকাফস্থল ত্যাগ করতেন না।

ইতেকাফের উদ্দেশ্যঃ
মানুষের ঝামেলা থেকে দূরে থেকে আল্লাহ তাআলার ইবাদতে একাগ্রচিত্তে নিয়োজিত হওয়া। এ লক্ষ্যে কোন মসজিদে অবস্থান করে আল্লাহর তরফ থেকে সওয়াব ও লাইলাতুল কদর লাভ করার আশা করা। ইতেকাফকারীর কর্তব্য হল অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে সালাত, কোরান তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, দুআ ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকা। তবে পরিবার পরিজন বা অন্য কারো সাথে অতিপ্রয়োজনীয় কথা বলতে দোষ নেই।

 

ইতেকাফকারী নিজ অন্তরকে সর্বদা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত রাখতে চেষ্টা করবে। নিজের অবস্থার দিকে খেয়াল করবে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের ব্যাপারে নিজের অলসতা ও অবহেলা করার কথা মনে করবে। নিজের পাপাচার সত্ত্বেও আল্লাহ যে কত নেয়ামত দিয়েছেন তা স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। গভীরভাবে আল্লাহর কালাম অধ্যয়ন করবে। খাওয়া-দাওয়া, নিদ্রা ও গল্প গুজব কমিয়ে দেবে। কেননা এ সকল কাজ-কর্ম আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরকে ফিরিয়ে রাখে। অনেকে ইতেকাফকে অত্যধিক খাওয়া-দাওয়া ও সাথিদের সাথে গল্প-গুজব করে সময় কাটানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এতে ইতেকাফের ক্ষতি হয় না বটে তবে আল্লাহর রাসূলের ইতেকাফ ছিল অন্য রকম।

ইতেকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস, চুম্বন, স্পর্শ নিষেধ। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :

وَلَا تُبَٰشِرُوهُنَّ وَأَنتُمۡ عَٰكِفُونَ فِي ٱلۡمَسَٰجِدِۗ #البقرة: ١٨٧

তোমরা মসজিদে ইতেকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না। [সূরা আল-বাকারা : ১৮৭]

শরীরের কিছু অংশ যদি মসজিদ থেকে বের করা হয় তাতে দোষ নেই। নবী করিম রাসূলুলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতেকাফ অবস্থায় নিজ মাথা মসজিদ থেকে বের করতেন। তখন আম্মাজান আয়েশা রা. তাঁর মাথার চুল বিন্যস্ত করে দিতেন।

ইতেকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়ার বিধানঃ
ইতেকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়া তিন ধরনের হতে পারে :—
এক. মানবীয় প্রয়োজনে বের হওয়ার অনুমতি আছে। যেমন পায়খানা, প্রস্রাবের জন্য, খাওয়া-দাওয়ার জন্য, পবিত্রতা অর্জনের জন্য। তবে শর্ত হল এ সকল বিষয় যদি মসজিদের গণ্ডির মাঝে সেরে নেয়া যায় তবে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না।

দুই. এমন সকল নেক আমল বা ইবাদত-বন্দেগির জন্য বের হওয়া যাবে না যা তার জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন রোগীর সেবা করা, জানাজাতে অংশ নেয়া ইত্যাদি।

তিন. এমন সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না যা ইতেকাফের বিরোধী। যেমন ক্রয়-বিক্রয়, চাষাবাদ ইত্যাদি। ইতেকাফ অবস্থায় এ সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতেকাফ বাতিল হয়ে যায়।

পরিশেষে মহান আল্লাহ তায়ালা রামাদানের শেষ দশকে বান্দাকে পূত পবিত্র নিষ্পাপ করার জন্য অগনিত নেয়ামত ও আমলের উপহার দিলেন। প্রতি বিজোড় রাত্রিতে ক্বদর রাত্রির অনুসন্ধান ও ইতিকাফের আমল দ্ধারা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করবেন। যেহেতু বর্তমানে মানুষের আয়ু কম সেদিকে লক্ষ রেখে মহান আল্লাহ তায়ালা একটি রাত্রিকে ছুরাশি বছর অনবরত ইবাদত বন্দেগি করার ন্যায় সমকক্ষ করেছেন। বান্দাকে পরিত্রাণ দিতে আল্লাহ তায়ালা নানা সুযোগের ব্যবস্থা করেছেন।

 

যাতে করে বান্দা তার মহান প্রভুর আত্মসম্মান নিয়ে স্বগৌরবে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। তাই রামাদানের এ দশকে জীবন থাকতে আল্লাহর কাছে ক্ষমার মাধ্যমে জাহান্নাম হতে মুক্তির গ্যারান্টি আদায় করতে পারি। নচেত দুনিয়ার জিন্দেগী ও আখিরাত আমাদের জন্য কষ্টের অন্যতম কারন হবে। সকলকে তাওফিক দিন। ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ, ওয়ামা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ। আমিন।

 

হাফেয মাওলানা মোঃ রাহাত উল্লাহ
সহকারী শিক্ষক – উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়
কো-অর্ডিনেটর, কলম সাহিত্য সংসদ লন্ডন
rumamun1986@gmail.com