মাহে রমজান প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে

মাহে রমজান প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে
মাহে রমজান প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে

রোজার উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। মহান আল্লাহ রোজাকে মুমিনের জন্য একটি প্রশিক্ষণ এবং দেহ ও মনের গঠনের মাস হিসেবে নির্ধারণ করেছে। মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় আছে। এর মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার রূপ, রস, গন্ধ অনুভব করে।রোজা ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষকে শিক্ষা দেয়। রিপুর তাড়না থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যারা এক মাস রোজা রাখার সৌভাগ্য লাভ করে তারাই হয় সফলকাম। রোজা আমাদের দেহ, মন ও রুহকে সুস্থ, সবল ও বিকশিত করে।

রোজাদার অশ্লীল, অশালীন ও নিষিদ্ধ জিনিস থেকে চোখকে ফিরিয়ে রাখবে। ভালো কাজ ও আমলের দিকে সে দৃষ্টিপাত করবে। কেননা নিষিদ্ধ ও হারাম কাজের ফলে তার আমল নষ্ট হয়ে যায়, অন্তর অশান্ত হয়ে পড়ে, আল্লাহর আনুগত্যের পথ থেকে সে ছিটকে পড়ে, ওই ব্যক্তি গুনাহর কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাই রোজার দিনে মহান আল্লাহর নিয়ামত চোখকে সংযত রেখে আমরা আমলের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট থাকব এবং তাকওয়ার গুণ নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করব।

কান আল্লাহর আরেকটি বড় নিয়ামত। এই অঙ্গ না থাকলে আমরা কোনো কিছুই শুনতে পারতাম না। আর কিছু শুনতে না পারলে আল্লাহর আদেশ মানার ক্ষেত্রেও আমরা সক্ষম হতাম না। কান প্রসঙ্গে সুরা বনি ইসরাঈলের ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে। তাই কান দিয়ে ভালো ও উপকারী বিষয় শুনতে হবে। আর মন্দ ও খারাপ কথা, কারো দোষত্রুটি এবং গিবতের কথা শোনা থেকে বিরত থাকতে হবে।

তাই রোজাদার কোরআনের বাণী, হেদায়েত ও কল্যাণের কথা শুনবে এবং সব ধরনের মন্দ কথা শোনা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে।

জিহ্বা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি কথার বাহন। জিহ্বা দিয়ে অনেক গুনাহর আমল সম্পাদিত হয়। এই অঙ্গ মানুষ জীবনে প্রতিটি মুহূর্তে ব্যবহার করে। তাই জিহ্বাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জিহ্বা বা কথা সব সময় রেকর্ড করা হয়। সুরা কাফের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তা-ই রেকর্ড করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত পর্যবেক্ষক আছে।

জিহ্বা সংযত রাখার বিষয়ে মহানবী (সা.) মুয়াজ (রা.)-এর কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘হে মুয়াজ! এটিকে সংযত রাখো। এ কথা বলে নবীজি নিজ জিহ্বার দিকে ইংগিত করেন। তখন মুয়াজ বলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), আমরা যেসব কথা বলি, সেগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ পাকড়াও করবেন? মহানবী (সা.) বলেন, সর্বনাশ। হে মুয়াজ! জিহ্বার খারাপ ফল হিসাব করেই মানুষকে তার নিজ চেহারার ওপর উপুড় করে দোজখে নিক্ষেপ করা হবে।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

অন্য একটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কথা বললে ভালো কথা বলে কিংবা চুপ থাকে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

রোজাদারের জন্য পেটের চাহিদার প্রতি খেয়াল রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেটের রোজার ওপর দেহের রোজার সঠিকতা নির্ভর করে। পেটের জন্য মানুষ খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় আহার ও পান করে। পেটের রোজা মানে পেটকে হারাম খাদ্য ও পানীয় থেকে বাঁচানো। তাই আহার ও পানীয় পবিত্র ও হালাল হতে হবে। সুরা মুমিনুনের ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুল! পবিত্র বস্তু থেকে খাবার গ্রহণ করুন এবং নেক কাজ করুন।’

সুরা বাকারার ১৭২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো।’ সব শেষে অন্তরের রোজা হলো মানবদেহের রোজার প্রধান ভিত্তি। কেননা অন্তরের সঠিকতা বা হেদায়েতই ইবাদতের মূল বিষয়। আমাদের যে নফস আছে তার তাড়না থেকে আমাদের অন্তর তা পরিপালন করে।

তাই অন্তরকে শিরক-বিদআত থেকে মুক্ত রাখা, বাতিল আকিদা-বিশ্বাস থেকে দূরে রাখা, অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রাখা রোজা সঠিক হওয়ার অন্যতম শর্ত। এসব খারাপ বিষয় অন্তরে লালন করে রোজার কোনো সার্থকতা নেই। তাই আমরা আমাদের প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাব।