অন্যান্যসমসাময়িক

মশা তাড়ানোর মানহীন পণ্য ; নেই কোন তদারকি

মশার যন্ত্রণায় এখন অতিষ্ঠ মানুষ। প্রতি কিউলেক্স মশার ঘনত্ব অন্য সময়ের চেয়ে চার গুণ বেড়েছে। অন্যদিকে, মশা নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাজে এখনো দৃশ্যত কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না।  নগরবাসীর ভরসা এখন নিজস্বভাবে কেনা মশা তাড়ানোর বিভিন্ন উপকরণ ও পণ্য। 

কিন্তু সেক্ষেত্রেও পাওয়া যাচ্ছেনা স্বস্তি। সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক নজরদারি না থাকায় এসব উপকরণ  কিনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঠকছেন ক্রেতারা। মশা তো দুর হচ্ছেইনা;  অন্যদিকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন নগরবাসী।

এখন মশা মারার বিভিন্ন উপকরণ রয়েছে বাজারে। এর মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহার হচ্ছে কয়েল। যদিও কয়েল মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) একটি বাধ্যতামূলক পণ্য। তবে সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো হাজার হাজার কয়েল তৈরির কারখানার মধ্যে বিএসটিআইয়ের মান সার্টিফিকেট রয়েছে মাত্র ১০৩টি প্রতিষ্ঠানের।

বাধ্যতামূলক পণ্য না হওয়ায় কয়েল ছাড়া মশা বিতাড়নের অন্যান্য পণ্যে তদারকি করা যাচ্ছে না। মানুষ হাজার হাজার পণ্য ব্যবহার করে। কিন্তু এর মধ্যে বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক পণ্য ২২৭টি, অর্থাৎ এই পণ্যগুলোর মান তদারকি করে থাকে বিএসটিআই।

এর বাইরে বাজার আর পাড়া-মহল্লার দোকানে বিক্রি হওয়া কয়েলগুলোর নেই কোনো মান ও কার্যকারিতাও। কোনো কোনো কয়েল জ্বালিয়ে মশা তাড়ানো যায় না। আর কিছু মশা তাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত কয়েলে দেখা যায়, মশাসহ টিকটিকি মারা যাচ্ছে। তার মানে ওইসব কয়েলে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে  অধিক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে কীটনাশক, যা মানবদেহের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর।

অনুমোদিত এবং বেপরোয়া কয়েল বাণিজ্যের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ই ধরা পড়ে। চলতি মাসেও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার দক্ষিণ মাতুয়াইল এলাকায় অবৈধ মশার কয়েল তৈরির একটি কারখানায় অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ওই অভিযানে এম অ্যান্ড আর এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানটি সার্টিফিকেশন মার্কস (সিএম) লাইসেন্সবিহীন অবৈধভাবে পণ্যের মোড়কে গুণগত মানচিহ্ন ব্যবহার করে কয়েল তৈরি ও বিক্রি করে আসছিল। সেখানে বেশ কিছু ব্র্যান্ডের কয়েল ছিল। কিন্তু নেই কোনো ল্যাব বা কেমিস্ট। এমনকি কয়েলে কত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় সেটাও বলতে পারেননি কোম্পানির কেউই। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে কারখানাটি সিলগালা করে দেয়া হয়।

মশা বিতাড়নের পণ্যে তদারকির অভাব

এদিকে মশার উৎপাত বাড়তে থাকায় বিদেশ থেকে আমদানি করা অ্যারোসল, স্প্রে ও ক্রিমের বিক্রি বেড়েছে। তবে এসব পণ্যের ওপরও নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ। এর মধ্যে কোনোটিই বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক পণ্য নয়। যদিও চাহিদা বাড়ায় দেশে এসব পণ্যের বড় বাজার তৈরি হয়েছে।

এসব পণ্য আমদানি বা তৈরি করতে গেলে শুধু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। দেশে এ পর্যন্ত ৪৫০টির বেশি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ধরনের মশার ওষুধের (অ্যারোসল, ক্রিম ও অন্যান্য) লাইসেন্স দিয়েছে সংস্থাটি। যার মধ্যে অধিকাংশই আমদানিকৃত। সব মিলিয়ে প্রায় ৮০টির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগুলো আমদানি ও উৎপাদন করে বাজারজাত করা হচ্ছে। তবে লাইসেন্স দেয়া ছাড়া মান নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার নেই উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাবলিক হেলথ গ্রেড অর্থাৎ মানব শরীরের সংস্পর্শে আসার এসব পণ্যের জন্য নির্ধারিত কীটনাশকের ব্যবহারযোগ্য মাত্রা রয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত মশার কয়েল ও স্প্রেতে পারমেথ্রিন, বায়ো-অ্যালোথ্রিন, টেট্রাথ্রিন, ইমিপোথ্রিনের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। কোনো পণ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় এসব ব্যবহার হলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে কিডনি রোগে এবং ক্যান্সারেরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এদিকে মশা মারার জন্য তৈরি বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলোরও একই অবস্থা। মানের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করেও সন্তুষ্টি মিলছে না সাধারণ মানুষের। কিনতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন বেশিরভাগ ক্রেতা। এখন মশা মারার ইলেকট্রিক ব্যাট, ইলেকট্রিক মসকিটো কিলার, পাওয়ার গার্ড মেশিন, মসকিটো রিপেলার মেশিন, কিলার ল্যাম্প, কিলিং বাল্বের মতো সামগ্রীর ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দামও।

অন্যদিকে দিন দিন কমছে মান। বিক্রি বাড়ায় চীন থেকে নিম্নমানের সামগ্রীই আমদানি হচ্ছে বেশি। আর নিম্নমানের হওয়ায় এসব পণ্য থেকে দুর্ঘটনার হারও বেড়েছে। সবশেষ গত ৫ মার্চ রাতে ফেনী শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কের শফিক ম্যানশনের পঞ্চম তলার একটি বাসায় মশা মারার ইলেকট্রিক ব্যাটে স্পার্ক থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
%d bloggers like this: